Thursday, December 31, 2020
ঘুম
Saturday, December 26, 2020
এবং
Monday, November 23, 2020
জমিদারি নয়
মন্দবাসা গুলো ভীড় করে আসে আসুক না,
রোজ সকালে, চোখের জলে দিনটা ভাসে, ভাসুক না।
দিনের শেষে, রুক্ষ বেসে, কষ্ট গুলো দেয় নাড়া,
মনের ঘরে একলা, ডরে, ইচ্ছেগুলোও ঘরছাড়া!
সময়ে অসময়ে অদৃষ্টও তোমায় দেখে হাসুক না,
তোমার হৃদয়, কারো জমিদারি নয়, নিজের মত বাঁচুক না।
সন্ধ্যে হলে, আঁধার নামে, মনের গহনে মৃত্যু চাও,
মনে হয় কেউ তোমার নয়, মৃত্যু হলে মুক্তি পাও!
গলা ফুঁড়ে আসে কষ্টগুলো, গিঁট মেরে যায় আলজিভে!
তবুও কি আজও স্বপ্ন দেখো, সময় কাটাতে মালদ্বীপে!
তোমার জীবনে, তোমার মনে স্বাবলম্বন জাগুক না,
তোমার জীবন কারো জমিদারি নয়, নিজের মত বাঁচুক না।
Saturday, November 21, 2020
হাল ছেড়ো না বন্ধু
Friday, November 13, 2020
চশমা
Tuesday, November 3, 2020
আঙুল
Sunday, November 1, 2020
কাঁধ
হঠাৎ, অনেকদিন পর গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার উত্তেজনাটা আনন্দ ও স্মৃতিমেদুরতায় ভরে গেলো যখন তেঁতুলগাছটার ছায়ায় দাঁড়িয়ে সামনের সবুজ ধানক্ষেতটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। এরই মধ্যে আচমকা, তেঁতুল গাছের ফোকর থেকে কাঠবিড়ালিটা আমার গা ঘেঁষে, সামনের মোরামের রাস্তা পেরিয়ে ধানক্ষেতে বিলীন হয়ে গেলো।
Friday, October 30, 2020
স্পর্শকাতর
আজকাল দিন বড়ই শক্ত, আবেগ জমে পাথর,
রোদ জল হাওয়া আমিষাশী, শিশির স্পর্শকাতর।
পায়ের নীচে ঘায়ের জমি, গায়ে বালি কিচকিচ,
হাত ছুঁয়ে গেছে আলকাতরা, আঙুল ভরা পিচ।
মাথার উপরে উড়ে যায় পাখি, ভয়-ময় মাথা ঢাকি,
বৃষ্টির ছাঁট, বন্ধ কপাট, আড়ালে আবডালেই থাকি।
শ্বাসবায়ু বিষ, ধারালো ধান-শিষ, পেট কাটে সিঁধ চোর,
সময়ের বুকে, গাড়ি ঘোড়া ঠুকে, যে যার দিচ্ছে দৌড়।
আঙুলে আঙুল ছুঁলে ঘাম জমে হাজা, প্রেম ট্রেম-এ লকডাউন,
চোখে চোখ পড়ে, রাগে গরগরে নেশা বুঁদ বি-টাউন,
হাথরাস, ফ্রান্স ঘুরে শীতঘুম দিয়ে দিব্যি গায়ে আতর,
তুমি আমি আমরা সবাই কোলেস্টেরল, ঘুম যে স্পর্শকাতর।
Saturday, June 6, 2020
গল্পের নায়ক
উত্তর কোলকাতার এক নাম না জানা ছোট্ট গলির মধ্যে প্রায় শয়েক মিটার ভেতরে এক ভাঙাচোরা ঘরের দোতলায় আমার বাস, প্রায় বছর তিনেক। এলাকাটা ঘিঞ্জি হলেও, নিচের তলা তো বাদই দিলাম, এই গলিতে আমি ছাড়া আর কেউ থাকে বলে এই তিনবছরে দেখিনি। প্রত্যন্ত পুরুলিয়ার এক গ্রাম থেকে কোলকাতায় এসে, এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের পড়ে থাকা বাড়িতে এসে মাথা গুঁজি। প্রথম প্রথম দু'একটা প্রাইভেট কম্পানিতে চাকরি করেছিলাম। কিন্তু তার সাথে লেখালিখিতে মোটেই সময় দিয়ে উঠতে পারতাম না। অগত্যা বছর খানেক আগে, চাকরি বাকরি ছেড়ে, লেখালিখিতে সম্পুর্ণ মননিবেশ করার কথা ঠিক করি। এই ঝুরঝুরে পোড়খাওয়া বাড়ির জন্য মাসের শেষে টাকা গুনতে হয়না, তাই একা মানুষ, ঠিক মানিয়ে নিচ্ছি।
আমার ড্রয়িংরুমটা আমার টেবিলের মতই ছড়ানো ছেটানো। খোলা জানালার পাশে একটু বাম দিক ঘেষে আমার টেবিল। জানালার ঠিক উল্টো দিকটায় আমার বসার চেয়ারটা রেখেছি। মাঝে মধ্যে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হারিয়ে যেতে বেস ভালো লাগে। এখন জানালার বাইরে দিয়ে যে আকাশটা দেখা যাচ্ছে তা পুঞ্জিভূত রোষ নিয়ে যেন ফুঁসছে, যে কোনো মুহুর্তে ফেটে পড়তে পারে। হোলোও ঠিক তাই। বাইরে থেকে একটা ঝিরঝির শব্দ কানে আসছে, আর সাথে মাঝে মধ্যেই গুড়গুড় শব্দও। বুঝলাম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। হালকা বৃষ্টির ছাট এসে গায়েও লাগছে বলে মনে হোলো। আমার চোখ কিন্ত ঠায় আমার খাতায় লেখা লাইনগুলোর ওপর।
দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল এর শেষে সন্ধ্যে নামার মুখে। প্রধান চরিত্রটা বেঁধে সবে দ্বিতীয় চরিত্রটায় হাত দিয়েছি, হঠাৎ দরজায় একটা টোকা পড়লো। এই অসময়ে আমার দরজায় টোকা এই তিনবছরে একবার পড়েছিল, সেও প্রায় বছর দুই আগে। আমার ওই দূরসম্পর্কের আত্মীয় জানাতে এসেছিলেন যে তিনি বিদেশে চলে যাচ্ছেন, এই বাড়ির সম্পুর্ণ দায়িত্ব আমার। তারপর আমার দরজায় টোকা দেওয়ার মত, আমার এই গলিতে থাকা বেড়াল, আর সকালবেলা দুধওয়ালা, লন্ড্রিওয়ালা আর খবরের কাগজওয়ালা ছাড়া আর কেউ নেই। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আবার একবার টোকা, একই রিথমে। না বেড়াল নয়। লেখা নিয়ে বসেছি, চরিত্রটার বিভিন্ন লেয়ার কিভাবে ফুটিয়ে তোলা যায় তা নিয়ে বিভিন্ন আইডিয়া মাথায় ঘুরছে, এর মধ্যে দরজায় টোকাটা বেস বিরক্তিকর ঠেকলো। ইতিমধ্যে আরো একবার, তবে টোকা নয়, প্রায় হাতের তালু দিয়ে ধাক্কা বল্লেই চলে। বেস বিরক্তি ও কিছুটা রাগের মাথায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দরজা খুলতে যাব ওমনি আরো একবার ধাক্কা। মাথার রগটা ইতিমধ্যে ফুলে উঠেছে, এক ঝটকায় দরজাটা খুলে রীতিমতো গালিগালাজ করতে যাব, হঠাৎ চোখে পড়লো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, প্রায় কাকস্নান করা এক যুবতি। আমি কিছু বলে ওঠার আগেই সে বোল্লো, "মাফ করবেন, এই বৃষ্টি বাদলের মধ্যে আটকে পড়ে গলিতে ঢুকে পড়েছিলাম। হঠাৎ বৃষ্টিটা বেড়ে যাওয়ায় আপনার সিঁড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম, কিন্তু সেখানে যেভাবে জল গড়াচ্ছে! একমাত্র আপনার জানালাটা খোলা দেখে, কিছুটা বাধ্য হয়েই দরজা ধাক্কালাম। যদি এই বৃষ্টির সময়টা একটু আশ্রয় পাওয়া যায় তো বাধিত হই। বৌদির কোনো শুকনো শাড়ি থাকলে একটু চেঞ্জ করে নিতে পারি, না হলেও চলবে, শুধু এই বৃষ্টির সময়টা যদি..."। আমি এমনিতেই মিতভাষী, মেয়েদের সাথে কথা বলতে গেলে আবার একটু আমতা আমতাও করি, তার ওপোর এতগুলো কথা একটানা কতদিন পর শুনলাম, খেয়াল নেই। অগত্যা কিছুটা ইতস্তত হয়েই, মাঝপথে তার কথা থামিয়েই বোল্লাম, "ভেতরে আসুন"।
তারপর বেস খানিকক্ষণ দুজনেই চুপ। সে ঘরের ভেতরে আসতে আমি আমার একটা আলখাল্লা শুকনো জামা আর একটা কাচা ইস্তিরি করা ধবধবে সাদা পাজামা তার দিকে বাড়িয়ে, বিরক্তিকর নিরবতা কাটিয়ে বল্লাম, "মাফ করবেন, এখনও বৌদির জোগাড় করে উঠতে পারিনি, যদি এই জামাটায় কাজ চলে যায়, তাহলে পাশের ঘরটায় গিয়ে চেঞ্জ করে নিতে পারেন।" ভদ্রমহিলার চোখে মুখে ইতস্ততভাবটা স্পষ্ট। কয়েক সেকেন্ডের ইতস্ততা কাটিয়ে আবার বল্লাম, "দরজার ছিটকিনিটা একটু সমস্যা করে, দরজাটা একটু জোরে টেনে ছিটকিনিটা লাগাবেন, আটকে যাবে"। এতগুলো কথা এক ঝটকায় বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেল্লাম। ইতিমধ্যে ভদ্রমহিলা সটান ভিতরঘরে গিয়ে দরজাটা এক ঝটকায় লাগিয়ে দিয়েছেন। বুঝলাম, খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর আলুথালু চুল দেখে বয়সটা একটু বেশিই মনে হচ্ছে আমার। আমি আবার আমার চেয়ারটা টেনে, হাতে কলম তুলে বসলাম।
কলমটা বেস চলছে হঠাৎ। দ্বিতীয় চরিত্রটা ফেঁদে গল্পের পটভূমি টা লিখতে সবে শুরু করেছি, হঠাৎ একটা শব্দে গল্পের জগৎ থেকে বাস্তবে এসে পড়লাম। আমার ছড়ানো ছেটানো ঘরে হাঁটাচলা করা আমি ব্যাতিত অন্য কারুর পক্ষেই বেস কষ্টকর। পেছন ফিরে দেখি, ভদ্রমহিলা আমার জামা আর পাজামা পরে, দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছেন। তার পায়ের সামনে গড়াগড়ি খাওয়া আমার একটা ঘটি থেকে জল পড়ে আমার মেঝেটা ভিজিয়ে দিয়েছে। আমি বিস্মিত হব, হাসবো নাকি রাগ দেখাবো বুঝে ওঠার আগেই, ভদ্রমহিলা বল্লেন, "মাফ করবেন, এভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে জিনিসপত্র রাখলে তো এরকম হবেই। আমায় একটা শুকনো ন্যাকড়া দিন, আমি জলটা পরিস্কার করে দিচ্ছি। ও হ্যাঁ আমার নাম চন্দ্রানী।" রান্নাঘর থেকে একটা শুকনো ন্যাকড়া এনে তার হাতে দিতে দিতেই চড়াক করে মাথায় খেলে গেলো একটা ভাবনা, 'কি নাম, চন্দ্রানী!' ছুট্টে আমার টেবিলটায় গিয়ে চোখ বুলিয়ে দ্বিতীয় চরিত্রটার নাম খুঁজে দেখি, চন্দ্রানী। বর্ননাটা কিছুটা এরকম, 'মাঝবয়সি, আলখাল্লা জামা আর পাজামায় অভ্যস্ত বাম চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত এক সুঠাম যুবতি চন্দ্রানী। গ্রামে গঞ্জে গিয়ে দুস্থদের সেবা সুস্রুসায় ব্রতি এক এন.জি.ও -র সাথে বেশ কয়েক বছর যুক্ত।' তড়াক করে জিজ্ঞেস করে বসলাম, 'কি করা হয় আপনার!' মৃদু একটা হাসি ঠোঁটের কোণে টেনে এনে চন্দ্রানী বোল্লো, "তা গুছিয়ে বলতে বেশ খানিকটা সময় লাগবে, চা খাবেন! আপনার টেবিলে চায়ের কাপ দেখে অনুমান করছি, রান্নাঘরে চা এর সরঞ্জাম সবই মজুদ আছে। আমার হাতের চা এর সবাই বেশ প্রশংসা করে, তার সাথেই নাহয় আমার কাজের ব্যপারটা খুলে বলবো। কি রাজি!" আমার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরলো না। মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাতেই, চন্দ্রানী রান্নাঘরে চলে গেলো চা বানাতে। আমি হুমড়ি খেয়ে পড়লাম খাতাটার ওপর, লাইনটা জ্বলজ্বল করছে চোখের সামনে, 'তবে তার কাজের জন্য যতটা সমীহ সে দাবি করে, ঠিক ততটাই প্রসংশনীয় তার হাতের চা।'
তাহলে কি, আমার লেখা চরিত্রটা আমার চোখের সামনে ফুটে উঠছে! এতক্ষণ গল্পের প্রধান চরিত্রটা আমায় ভাবায়নি, কিন্তু এবার ভাবাচ্ছে। ল্যামির পেন, মার্লবোরো সিগারেট সব যেন এক্কেবারে মিলে যাচ্ছে। পেনটা খাতার মধ্যে রেখে, হুড়মুড়িয়ে বন্ধ করে দিলাম খাতাটা। মাথাটায় আবার কিরকম চিনচিনে একটা ব্যাথা। একটা সিগারেট বের করে ধরাতে যাবো ততক্ষণে চন্দ্রানী ট্রেতে করে চায়ের দুটো কাপ সাজিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ট্রে থেকে কাপ দুটো টেবিলে রেখে, আমার চেয়ারটা চন্দ্রানীকে ছেড়ে দিয়ে, আরেকটা চেয়ার টেনে বসলাম তার পাশেই। চায়ে চুমুক দিতে দিতে চন্দ্রানী বলতে শুরু করল, "আমি আসলে একজন নার্স, সামনের দুটো লেন ছেড়ে যে নার্সিংহোমটা আছে ওখানেই আমি কাজ করি।" শুনেই মন থেকে ভারটা যেন নেমে গেলো, যাক তাহলে এতক্ষন যা ভাবছিলাম সবটা নেহাতই কোইনসিডেন্টাল। আর স্বস্তির বিষয় হোলো গল্পের লেখক বিবাহিত, নাম রেখেছি রুদ্র। "ওহো খেয়ালই করিনি, শুধু শুধু চা খাচ্ছেন, দাঁড়ান কয়েকটা বিস্কুট নিয়ে আসি", বলে খোস মেজাজে রান্নাঘর থেকে প্লেট সাজিয়ে বিস্কুট এনে রাখলাম টেবিলে। "আপনার নামটা কিন্তু এখনও জানা হোলো না" বলে উঠলো চন্দ্রানী। কিছুটা লজ্জান্বিত হয়েই বোল্লাম,
- "ইসসস দেখেছেন তো কি ভুলো মন, আমার নাম নীল।"
-"বাহ বেশ ভালো নাম, নীল, শিবের নাম। আমার ভাইয়ের নামও শিবের নামে রাখা, রুদ্র।"
আবার একটা খটকা, রুদ্র! আমার গল্পের লেখকের নাম! দুম করে আবার একটা প্রশ্ন করে বসলাম,
- "লেখালিখি করে!"
- "ভাই আর লেখালিখি, না না। আন্তপ্রনয়র এর কাজ করে, প্রধানত সফটওয়ার ডেভেলাপমেন্টের কাজ। আর সাথে ওই একটু আধটু ব্লগ লেখা, এই যা। বিয়ে থা করে এখন দিব্যি সংসার করছে। বৌ এর নাম কৃত্তিকা।"
- "আর আপনি, বিয়ে থা করেননি!"
-"না আসলে, আমি একটা এন.জি.ও. এর সাথেও যুক্ত। গ্রামে গঞ্জে গিয়ে দুস্থদের পাশে দাঁড়ানো তাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে বেস খানিকটা সময় বাইরে বাইরেই কাটাতে হয়। বিয়ে থা এর ব্যাপারে ভেবে ওঠারই অবকাশ পাইনি।"
সব যেন কিরকম গুলিয়ে যাচ্ছে। যেন এক শব্দবন্ধ সলভ করছি, সব মিলে যাচ্ছে শুধু যেই শেষে পৌছোই, অংকটা মেলে না। কিরকম একটা দমবন্ধ দমবন্ধ লাগছে। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় বৃষ্টির ছাট এসে ভিজিয়ে দিলো আমাদের দুজনকেই। চেয়ার ছেড়ে উঠে জানালার পাল্লাটা বন্ধ করতে যাব, ওমনি চোখ পড়লো আমার গল্পের খাতার ওপর। দমকা হাওয়ায় খাতাটা খুলে গেছে। যে লাইনটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো, তা দেখে আমার গলা শুকিয়ে এসেছে। লাল কালিতে লেখা, 'নীলের লাল রক্তে ভেজা শরীরটা হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে রান্নাঘরে টেনে নিয়ে যেতে ঘাম ছুটতে লাগলো চন্দ্রানীর'। নীল, এই চরিত্র আমি কখন বুনলাম, আমি তো সবে..., কিছুই ভালো ঠেকছে না। "আপনি ওটা কি লিখছেন, গল্প! কৈ দেখি"। চন্দ্রানীর কৌতুহল ভরা প্রশ্নের উত্তরটা যতটা সম্ভব এড়িয়ে গিয়ে, কিছুটা থতমত হয়েই "না না, সেরকম কিছু না" বলে, খাতাটা বন্ধ করে, তার ওপর পেপারওয়েট চেপে বোল্লাম,
-"ওই আর কি, একদম পাতি কিছু একটা, দিনপঞ্জি বলতে পারেন। দুদিন লেখা হয়নি তাই ভাবলাম আজ লিখে ফেলি। বৃষ্টির জল এসে তো চা এর আমেজটাই মাটি করলো, যদি আরেককাপ চা হয় মন্দ হয় না, কি বলেন।"
-"একদম আমার মনের কথাটা বলেছেন। আর সাথে আপনার হাতের চায়ের স্বাধটাও নেওয়া হয়ে যাবে।"
নিরুপায় হয়েই রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালাম, কিন্ত মনের মধ্যে ঘুরছে গল্পের খাতা। রান্নাঘরে ঢুকে দেখি, আমার চায়ের সরঞ্জাম সব একদম ঠিক ঠিক জায়গায় সাজিয়ে রেখেছে চন্দ্রানী। এমনকি, চায়ের কেটল অবধি ধুয়ে তার যথাস্থানে রাখা। ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত ঠেকলেও, আপাতত এই বিষয়ে ভেবে সময় নষ্ট না করে দুকাপ চা বানিয়ে ফেল্লাম। দুকাপ চা বানিয়ে কাপে ঢালতে গিয়ে হঠাৎ চোখে পড়লো, চায়ের কাপ দুটো এমনকি ট্রেটাও কোন সুযোগে যথাস্থানে রেখে গেছে চন্দ্রানী। আরেকটা জিনিস চোখে পড়লো, যাতে আমার নাভিশ্বাস উঠলো। আমার বাটার নাইফ টা নেই। আমি মাঝে মধ্যেই জিনিসপত্র এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখি বটে, কিন্তু সকালের ব্রেকফাস্টের পর সেটার ব্যবহার হয়নি। তবুও রান্নাঘরের চারিদিকে চোখ ফেরালাম, কিন্তু চোখে পড়লো না। ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতে পারলাম না৷ তাড়াহুড়ো করে চায়ের কাপ দুটো ট্রেতে সাজিয়ে নিয়ে রান্নাঘর থেকে ড্রয়িংরুমে ঢুকেই, চক্ষু চড়কগাছ। গল্পের খাতাটা খুলে তার ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে, চোখ বোলাচ্ছে চন্দ্রানী। শিগগিরই ওর হাত থেকে খাতাটা বাজেয়াপ্ত করার উদ্দ্যেশ্যে "আরে ওতে কি দেখছো, কিসস্যু নেই সেরকম!" বলে হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে যেতেই চোখে পড়লো, খাতার পাতার ওপর লাল কলমে লেখা পাতাটা হাঁ করে খোলা। আমার দিকে ফিরে একটা বিকট স্বরে খিলখিলিয়ে হাসছে চন্দ্রানী। ডান হাতে ধরা আমার রান্নাঘর থেকে উধাও হওয়া বাটার নাইফ। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে, দুহাত দিয়ে বাটার নাইফটা কাড়তে গিয়ে, চায়ের ট্রেটা মাটিতে পড়তেই, তিব্র জ্বালায় আমার পাদুটো ঝলসে উঠলো। আর কিছু বুঝে ওঠার আগেই, হুমড়ি খেয়ে পড়লাম সামনের দিকে।
হাতে একটি চিনচিনে ব্যাথায়, চোখ দুটো খুলতেই দেখি, হস্পিটালের বেডে শুয়ে। হাতে স্যালাইন চলছে। মাথা, তীব্র যন্ত্রনায় ফেটে যাচ্ছে। ঝাপসা চোখে দেখতে পাচ্ছি, আমার বাম দিকে, সাদা শাড়িতে একজন নার্স ইঞ্জেকশনের একটা সিরিঞ্জ থেকে ব্লাড স্যাম্পল নিয়ে তাতে লেবেল সাঁটতে সাঁটতে বলছে, " ব্লাড টেস্ট রিপোর্টটা কাল সন্ধ্যে ছটার পর ডেসপ্যাচ থেকে কালেক্ট করে নেবেন।" হঠাৎ আমার ডান দিক থেকে ভিষণ চেনা একটা গলার স্বর ভেসে এলো, "আচ্ছা ঠিক আছে, আর ভয়ের কোনো কারণ নেই তো"! চোখ ফেরাতেই দেখি, আমার বৌ কৃত্তিকা।
Sunday, March 22, 2020
রোনালদো vs বালাক
১৯৯৮, স্কুলে যাওয়ার পথে লোকজনের কানাঘুষো শুনছি, এবারও ব্রাজিল। তখন থেকে বুঝেছি, ফুটবল বিশ্বে যতগুলোই দেশ থাক না কেন, ভারতের ফুটবল প্রেম পোলারইজড, পেলে আর মারাদোনার দলে। সে বছর অবশ্য জিনেদিন জিদানের জাদুতে ব্রাজিলকে ফাইনালে ধূর্মুশপেটা করলো ফ্রান্স। বুঝতে দেরি হয়নি, সমাজ, লোকজনের পোলারাইজেশন এর বাইরেও আরো অনেকটা বড়, আরো অনেক কিছু নিয়েই বাস্তব। এভাবেই আমার ফুটবলের ধারণা, অন্যান্য সব রকম ধারণা গড়া শুরু।
Monday, March 2, 2020
ফুটনোট
মেঘ জমা ওই আকাশ জুড়ে জমতে থাকে মান'ভিমান।
কাগজে মোড়া আকাশ কুসুম, ভাসিয়ে নিলো চোখের জল,
রঙিন খামে, শেষ চিঠিতে, ফিরিয়ে দিলাম, তাজমহল।
ঝড়ের তোড়ে পাল ছিঁড়েছে, ছোট্ট নাও ও আধ পাগল,
সাগরপাড়ে আছড়ে পড়া টুকরো কাঠের বুক চিরে,
উঁকি মারে হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন, ঢেউয়ের ভিড়ে।
শেষ স্তবকে গুছিয়ে রাখা আবেগ গুলোর আজ ছুটি,
কার্বনেটের অধঃক্ষেপে বুদবুদ ওঠে খুনসুটি,
মেঘ মল্লারে নির্ঘোষ ছাড়ে বারবার দুঃক্ষযাপন,
লাগাম ছেড়ে, বেয়াক্কেলে, আবার নতুন ভিৎস্থাপন।
Friday, December 20, 2019
দাহ্য
আমার তো দেশ আছে, তোমার কে জানে!
মাটিতে মিশেছে দেহ, জাতিতে মেশেনি,
লোক ভাষা সংস্কৃতি, থালা বাটিতে মেশেনি,
কলমে ভাঙানো শোক, নিভু নিভু আলো,
কাল সব এক ছিল,
আজ তুমি বড্ড খারাপ আমি কিন্তু ভালো।
শিরদাঁড়াহীন মানুষের ভালো থাকার নাটক,
ঢের হয়েছে অপেক্ষা ওরে আচ্ছে দিনের চাতক,
সন্ধ্যে ঘনালো,
রাত্রি নামার আগে যদি একটিবার মর্মান্ধতা ছাড়ো,
আগুন লাগার আগে দাহ্য ধর্মকে পুড়িয়ে ফেলতে পারো!
Tuesday, December 17, 2019
দিলওয়ার
সময়টা প্রায় মধ্য রাত্রি, বেশ কয়েকবার নিজের টিফিন বাক্স টা খুলে রাতের খাবারটা খেয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেও বিফল হয়েছেন রামবাবু। বাইরের অবস্থাটা এখন খুবই শান্ত, তবে মাঝে মধ্যেই অস্থির করা শব্দ কানে আসছে।
এরপর দরজা দিয়ে যে চেহারাটা ভেতরে ঢুকে এলো, তার অগোছালো চুল, লাল কালো জমাট বাঁধা রক্তের ছোপে ভরা মুখের সাথে মানানসই কালি পড়া সন্ত্রস্ত চোখে চোখ রেখে রামবাবু বললেন, 'বলুন কি সাহায্য করতে পারি'! কাতর গলায় কম্পমান ঠোঁটের অবাধ্যতা সামলে সে উত্তর দিল, 'স্যার, আমার ডান উরুতে একটা গুলি লেগেছে, প্রচন্ড ব্যাথায় কাতরাচ্ছি, যদি একটু দেখে ওষুধ দিয়ে দ্যান।' চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে, দু পা হেঁটে তার দিকে এগিয়ে এসে তার উরুতে চোখ বুলিয়ে স্থির গলায় রামবাবু বললেন, 'গুলি লেগেছে শুধু নয় বিঁধে আছে। সামনের বেড টায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়'। ভদ্রলোকের হাঁটা আগে চোখে পড়েনি, এবার বেড অব্ধি যেতে তার কষ্টটা চোখে পড়লো। পা টিপে টিপে, ছোট্ট ছোট্ট পদক্ষেপে সে এগোচ্ছে আর প্রত্যেক পদক্ষেপের সাথে ব্যাথায় বিকৃত হয়ে যাচ্ছে তার মুখ। হাতে গ্লাভস পরে শুরু হোলো তার অস্ত্রোপচার।
লোকাল এনেস্থিসিয়ার ইঞ্জেকশনটা দিতে দিতে রামবাবু তাকে প্রশ্ন করলেন,
- 'কিভাবে হোলো এটা'?
- 'স্যার আর বলবেন না, গ্রামের প্রান্তে আমার মুদিখানার দোকান। হঠাৎ দেখি পাশের গ্রামের মুসলমানরা আমাদের দোকানগুলোতে আগুন লাগাচ্ছে। সেই দেখে আমরা সবাই যা হাতের কাছে পাই, লোহা লক্কড়, সাবল গাইঁতি, নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। কিন্তু ওরা অনেকে ছিলো। বেস কয়েক লাঠির ঘা, জ্বলন্ত আগুন ঠেলে কোনো মতে পালিয়ে বেঁচেছি। এই গন্ডগোলের মধ্যে কেউ পিস্তল ও চালিয়েছে। তারই একটা এসে লেগেছে আমার উরুতে, প্রাণে বেঁচে গেছি, এই রক্ষে।'
ইতিমধ্যে অস্ত্রোপচার এর বাক্স খুলে, যন্ত্রপাতি গুলো কে স্টেরিলাইজ করতে করতে প্রশ্ন করলেন রামবাবু,
- ' কিন্তু হঠাৎ আগুন লাগালো কেন?
- 'স্যার ওরা এরকমই। আমাদের গ্রাম থেকে জল নিয়ে যায়। ওদের ছোওয়ায় আমাদের জাত যাবে না, তাই আমরা ওদের জল নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। তবুও শোনে না। তাই কেও এদিকে জল নিতে এলে পাথর মেরে তাড়িয়ে দি। আজ সকালে একটা বাচ্চা স্কুল যাওয়ার পথে আমাদের গ্রামের কলে জল খেতে এলে আমরা তাকে ভালো ভাবেই বলি জল না খেতে, তাতে তার সাথে থাকা এক বয়স্ক ভদ্রলোকের গায়ে লাগে। সে গালিগালাজ জুড়ে দেয়। তাতে লোকজন তাদের ওপোর চড়াও হয়, লাঠিশোটা নিয়ে। লোকটা পালিয়ে যায় কিন্তু বাচ্চাটা পালাতে পারেনি। ঘন্টা কয়েক পরে তার লাশ নিতে এসে তলোয়ার ভোজালি চালিয়ে জখম করে দিয়ে গেছে আমাদের বেস কিছু লোকজনকে। সেই থেকেই মার দাঙ্গা চলছে। বউ বলেছিল আজ দোকানে না যেতে, পাত্তা দিইনি, এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি',
বলেই একটা তীব্র গোঙানি। রামবাবু রক্ত মাখা চিমটে আর ছুরিটা পাশে রেখে, 'গুলিটা বের করে দিয়েছি, হাত টা ধুয়ে এসে ওষুধটা লাগিয়ে ব্যান্ডেজটা করে দিচ্ছি' বলে আবার গ্লাভস টা খুলে হাতটা ধুতে লাগলেন।
হঠাৎ বাইরে আবার সেই চিল চিৎকার শোনা যেতে লাগলো। তবে এবার সেটা মুহুর্তে থামলো না। চিৎকারের শব্দ আরো প্রকট হতে লাগলো। দড়াম করে দরজা খুলে ঢুকে পড়লো বিভু। রামবাবু কিছু বুঝে ওঠার আগেই গলগল করে বইতে থাকা রক্তে ভেসে গেলো মেঝেটা। ডান হাতটাকে বাম হাত দিয়ে জোরে চেপে বিভু বললো, 'স্যার তাড়াতাড়ি পেছনের দরজা দিয়ে পালান, ওরা ঢুকে পড়লো বোলে।' তার কথা শেষ হতে না হতেই দরজা প্রায় ভেঙেই একদল ছেলে ঢুকে পড়লো। সবার হাতে লাঠি, তরোয়াল। ঢুকেই প্রায় থ মেরে গিয়ে একজন রামবাবু কে দেখে বলে উঠলো, 'রহমত আলি খাঁ সাব, আপনি! আপনি এ গাঁয়ে কি করছেন। এই শুয়োরের বাচ্চাদের চিকিৎসা করছেন। এর খেসারত কিন্তু আপনাকে দিতে হবে'। রামবাবু বিভুর দিকে এগিয়ে গিয়ে, তার বাম হাতটা সরিয়ে ডান হাতটা দেখতে দেখতে বোল্লেন, 'তা তোমরা কি চাও, এভাবে সবাইকে মেরে ফেলবে!' আরো একটু মৃদু গলায় বিভুর চোখে চোখ রেখে, 'ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে। ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছি ঠিক হয়ে যাবে', বলেই ছেলেগুলোর দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন,
-'কি হোলো, উত্তর দাও'।
-'কিন্তু খাঁ সাব আপনি থাকতে, আপনাকে আব্বু আম্মি খুব শ্রদ্ধা করেন। আপনি যদি আমাদের পথটা ছেড়ে দেন।'
-'আর যদি না ছাড়ি'!
-'তাহলে আমরা ভুলে যাবো আপনি কে'।
ঠোঁটের কোণে একটা আলতো হাসি টেনে এনে বলতে শুরু করলেন রামবাবু ওরফে রহমত আলি।
-'তখন সত্তরের দশক, গাঁয়ে মহামারি, প্রায় সব ঘরেই কেউ না কেউ আক্রান্ত। তখন হিন্দু মুসলমানদের আলাদা আলাদা গ্রাম ছিলো না। আমি সবে গাঁয়ে এসেছি। নতুন ডাক্তার। সেভাবে কেউ চেনেনা আমাকে। গাঁয়ের ঘরে ঘরে গিয়ে চিকিৎসা করে বাঁচিয়ে তুলেছি তোদের বাপজানেদের, হিন্দু মুসলমান বিচার না করেই। আমাকেও কেউ আমার জাত জিজ্ঞেস করেনি। তারপর হিন্দু মুসলমান ভাগাভাগি হোলো, তাই রামবাবু হয়ে এই গ্রামে আসতে হয় চিকিৎসা করতে। আমার কাজ প্রাণ দেওয়া, তাতে নিজের প্রাণ গেলেও আপত্তি নেই। '
-'বেস তবে তাই, আপনি যখন পথ ছাড়বেন না..'
ছেলেটার কথা কেটেই রাম বাবু বললেন,
-'তুই নিসার আলির ছেলে, দিলওয়ার না। তোর মা তখন পোয়াতি, যক্ষায় ধরেছে তাকে। নিসু আমাকে বলেছিল, বাচ্চাটাকে বাঁচাতে পারুন না পারুন, বৌটাকে বাঁচান। ওর কাঁধ চাপড়ে বলেছিলাম, মেয়ে হলে নাম দিলরুবা রেখো আর ছেলে হলে দিলওয়ার।'
Monday, October 28, 2019
পথ
সে পথের ফুল যেমন তোমার, কাঁটাও তোমার,
সে পথের ধারের সর্ষে বাগানও তোমার, ফণীমনসাও।
তুমিই শিক্ষানবিশ, তুমিই শিক্ষক।
নিজেকে পথের ওপোর লোপাট করে ফেলে দেওয়া তুমি,
পথ ধরে ছুট্টে বেড়ানো তুমি,
দিন রাত, ভালো মন্দ, পাওয়া খোয়া,
তুমি আর পথ এখন একাকার।
যখন বেছেছিলে, পথ তোমার ছিল,
এখন পথের তুমি।
Thursday, September 26, 2019
বিহাইন্ড দ্যা সিন
অশ্রুভেজা ঝাপসা চোখে, একটু হাঁটি,
জলকাদাময় রাস্তা জুড়ে ছড়িয়ে আছে,
কাঁপুনি দেওয়া গা ব্যাথা জ্বর, বেশ ছোঁওয়াচে
তোমার আমার কাটানো সময়, ঝগড়াঝাটি,
কান্না হাসি, ভালো মন্দ, রান্নাবাটি,
এসেছি ফেলে বে আক্কেলে, বিহাইন্ড দ্যা সিন,
ফের দেখা হবে, যদি পাই কভু টাইম মেশিন।
Tuesday, February 5, 2019
প্রোটোটাইপ
না বলা কথা কিছু গোপনে লোকানো আছে খোয়াই নদীর জলে,
ঘুম ভাঙা শহরের আলসেমি ভরা আকুতি যদি শোনো,
মিলেমিশে এক হয়ে যায় ক্ষোভ, দারিদ্র্য, প্রেম, ঈর্ষা, স্নেহ।
কোনো টনিকে সেরে ওঠেনি জ্বর, হাড় মাসে উই ধরেছে কবে,
রোদ উঠলে এলিয়ো তুমি গা, আমায় আবার ট্রেন ধরতে হবে।
একটা রিং কোরো, ঘুমকাতুরে ফুস্মন্তরে যক্ষা যদি সারে,
কথা দিলাম ভিড়ের মাঝেও আমিই প্রথম আসবো তোমার দ্বারে।
এখনও বিরহ আসে,
ডানা ঝাপটানো অনুভূতি গুলো ঘুঙুর পায়ে ঘুরপাক খায় আমাদেরই আসেপাসে,
ভোরের কুয়াশার মত জমতে থাকে মনের ডগায়,
আমরা ভাবি চোখের কোণে তার বাসা,
দিন ক্ষন দেখেনা প্রেম, বাধ মানেনা বেবাক ভালবাসা।
Thursday, December 27, 2018
ফাঁস
যুদ্ধ শেষে বুকফাটা শোক, ভেজা মাটি তরতাজা,
ছিন্নভিন্ন পড়ে আছে শব, তির ঢাল তরবারি,
কেও ফেরেনি ঘরে, রাঙা বাস পরে, ওত পেতে সংসারী।
লাঙলের ফালি, বুক চিরে কবে দুমুঠো অন্ন আনবে ঘরে!
বস্ত্রহীন রুগ্ন শিশু রাস্তার 'পরে ছুটে যায় আনমনে,
নীলাকাসে থ মেরে থাকা বুবুক্ষু বাজ, নিঃশব্দে 'মাদ গোনে।
যেখানে মাছের বাজার ছিল, আজ আঁশ তুলে চাটাচাটি,
চুল্হায় সদ্য আগ-নেভা ছাই, দোমড়ানো ভাঙা থালা বাটি,
হটাৎ দূরে ভেজা মাটি চিরে মুখ তুলেছে ধানের শিস,
আনমনা শিশু, ঘাড় মটকিয়ে মুখে পোরে, পুঁজিবাদ বলে আমায় দিস।
Monday, October 1, 2018
The plethora thus continues
Tuesday, August 28, 2018
কাটলে পড়ে রক্ত!
রাগে রক্তচক্ষু, লজ্জায় মুখ লাল, আজও কি হয়!
আজও কি হুড়মুড়িয়ে ঘুম থেকে ওঠো, ভয় পেয়ে?
আজও কি বুকটা চিনচিনিয়ে ওঠে, সমবেদনা জাগে!
ভোরের ভৈরবী গেয়ে যাওয়া পথিকের গানে জাগে প্রাণ?
আজও কি খোঁজো জীবনের মাঝে সুখ আনন্দ ভাব ভালবাসা?
বিস্ময় জাগে, কিভাবে বদলে গেছে সব,
ব্যাস্ততার টালবাহানায়, জীবনের সাতে পাঁচে মস্তিষ্ক আজ জড়।
জানি আজও ভোরের আলো ফোটার আগেই তুমি উঠে পড়,
ভোরের মাড়ুলি সেরে কাঠের উনান পাতা চালা,
শিশির ভেজা তুলসীমঞ্চ,
আজও ধুয়ে মুছে সাফ কর তুমি।
দুমুঠো ভাতের জোগাড় কর,
কলসি ভরে গাঁয়ের পথ বেয়ে জল ভরে আনো,
- কিসের টানে!
যে গল্প কোথাও লেখা নেই, তার ইতিহাস শুধু অদৃষ্টই জানে।
শহরের রাস্তা ধরে বাঁচা মরার লড়াই চলে রোজ,
রাস্তার যানজটে মুখ বাড়িয়ে দেখো,
তার চেয়েও বড় জট লাগা, সম্পর্কগুলো, ঝাপসা।
রোজ অচেনা, অফিস যাওয়া লোকগুলো চোখ পড়লেই মুচকি হাসে,
ভিড় বাসে বসে থাকা লোকটা তোমার নাজেহাল অবস্থা দেখে বলে, 'দিন ব্যাগটা আমি ধরি',
চায়ের দোকানের কুকুরটা তোমার ছুঁড়ে দেওয়া বিস্কুটের জন্য তোমায় দেখলেই লেজ নাড়ে,
তুমি এদের কাউকেই কি চেনো?
সারাদিনের ব্যাস্ততার মাঝে খবরের কাগজটা ওলটপালট,
খেলার পাতা সেরে সোজা চলে যাও শব্দছকে,
রোজ দুপুরের চলনসই খাবারের পর নিয়ম করে মুখশুদ্ধি,
ফেরার পথে মাঠের ধারে একটু দাঁড়িয়ে ছেলেগুলোর ফুটবল খেলা দেখো,
ওই লাল গেঞ্জি ছেলেটার খেলা খুব ভাল লাগে না তোমার!
ও যখন রাইট উইং ধরে ড্রিবল করে, তুমি ওকে বাহবা দাও,
ও তোমায় দেখে মুচকি হাসে।
হঠাৎ তুমি বড় পোষ্টে চাকরি পেলে,
গাড়ি করে অফিস যাও,
তারপর বিদেশি ডেলিগেটস দের সাথে গরম কফি,
চায়ের বালাই আর নেই,
কুকুরটা আজ হয়তো অন্য কারুর জন্য লেজ নাড়ে।
ম্যাগাজিনটা উল্টেপাল্টে দেখো ঠিকই,
খেলা শব্দছকের নেশাটা আর নেই।
দুপুরের লাঞ্চের শেষ পাতে রোজ রকমারি ডেসার্ট।
অফিস থেকে ফেরার পথে ট্রাফিকে যখন তোমার গাড়িটা দাড়াঁলো,
ডান উইং দিয়ে ড্রিবল করে গোলে রাখা বলটা ছিটকে এসে লাগলো তোমার গাড়ির কাঁচে,
আজ তুমি বাহবা দিলে না,
রেগে সজোরে বলটা মেরে উড়িয়ে দিলে ভিড় রাস্তার মাঝে,
ওই লাল গেঞ্জি ছেলেটা আজও তোমার দিকে তাকিয়ে,
শুধু মুখের মিষ্টি হাসিটা আজ নেই।
সত্যি বল, আজও কি কোথাও এই সম্পর্কগুলো আছে বেঁচে,
কংক্রিটের রাস্তাঘাটে গাড়িঘোড়া চড়েও কি আজও মাটির গন্ধটা নাকে ভাসে?
শরীর কাটলে আজও রক্ত পড়ে, জানি,
কিন্তু সম্পর্কগুলো!
Tuesday, May 22, 2018
দ্য আদার সাইড
বাইরের ঠান্ডা বাতাশের সাথে ঝিরিঝিরি বৃষ্টিও শুরু হয়েছে। আবহাওয়া ক্রমে শীতল হলেও এরই মধ্যে রূপালির কপালে ঘাম জমেছে। প্রায় ঘন্টা দুয়েক হয়ে গেল পলাশ বেরিয়েছে, এতক্ষণে তো ফিরে আশার কথা। একটু অধৈর্য ও চিন্তান্বিত হয়েই পলাশের ফোন নাম্বারটা ডায়াল করলো রূপালি। "আপনি যে নম্বরটিতে কল করেছেন সেটি এই মুহূর্তে হয় সুইচড অফ অথবা পরিষেবা সীমার বাইরে। অনুগ্রহ করে কিছুক্ষণ পরে চেষ্টা করুন।" তারপর প্রেশারকুকারে কটা সিটি পড়েছে তা আর গোনা হয়ে ওঠেনি রূপালির। দশ পনেরো মিনিটের মধ্যে প্রায় পঞ্চাশবার পলাশের নাম্বারটা লাগানোর চেষ্টা করেছে।
আবার টিভির সামনে গিয়ে মুখ গুঁজে বসলো রূপালি। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ছাপিয়ে এখন চড়াম চড়াম বাজ পড়ছে। মাস চারেক আগে বাজ পড়েই তাদের বাড়ির টিভিটা নষ্ট হয়ে যায়। আর সেদিনই বাজপড়ে মারা যায় তাদের পোষা মিরাক্কেল। তারপর থেকেই তাদের ঘরের অলিখিত নিয়ম, মেঘ দেখলেই টিভি বন্ধ করতে হবে আর বাইরে বেরোনো যাবেনা। আজ পলাশ আর রূপালি দুজনেই নিয়ম ভাংলো। আজ আর টিভি বন্ধ হোলো না। হুড়মুড়িয়ে সেই লোকাল চ্যানেলটা খুলতেই দুম করে কারেন্ট চলে গেল। এলোমেলো হাওয়ায় জানালার পাল্লাগুলো ঝনঝন করছে, সাথে প্রেশারকুকারে আরেকটা সিটি। চারিদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে আর তার সাথে রূপালির মনে চিন্তার মেঘ ও।
'মাকে একটা ফোন করি!' মনে মনে ভাবছে রূপালি। ' না না, এখনি ফোন করা ঠিক হবে না, আরো কিছুক্ষণ দেখি'। বেশ খানিকটা সময় পেরিয়ে গেছে, সিটি গোনা হয়নি, কুকারটা পাশে নামিয়ে ওভেনটা বন্ধ করলো। তারপর আবার পলাশের নাম্বারটা চেষ্টা করতে গিয়ে দ্যাখে, ফোনটা ডেড। মনে মনে প্রচন্ড রাগ হোলো পলাশের ওপর, 'কতবার বলেছি বাড়ির জন্য একটা মোবাইল ফোন কিনতে, সময়ে অসময়ে ফোন ডেড হয়ে পড়ে থাকে।' এইতো মাসখানেক আগের কথা, পলাশ তখন হপ্তাখানেকের জন্য অফিসের কাজে বাইরে। রাত প্রায় সাড়ে দশটা, হঠাৎ রূপালির বুকে ব্যাথা শুরু হয়। কি করা উচিৎ বুঝতে না পেরে ফোন করে পলাশকে। কিছু বোলে ওঠার আগেই ফোনটা কেটে যায়, তারপর ফোন ডেড। এন্টাসিড খেয়ে রূপালি ঘুমিয়ে পড়ে সেদিন, পরেরদিন তার ঘুম ভাঙে কলিং বেলের আওয়াজে, বাইরে পলাশ দাঁড়িয়ে। চাকরিটা সে যাত্রায় বেঁচে গেলেও তার জন্য কম খেসারৎ পোহাতে হয়নি পলাশকে।
রাগ ছাপিয়ে ভর করলো চিন্তা, 'না এভাবে তো বসে থাকা যায়না '। ছাতাটা হাতে তুলে নিয়ে, দরজা খুলতে যাবে ওমনি কানে এলো, জোরে জোরে কে যেন দরজা ধাক্কাচ্ছে, অনবরত, জোরে আরো জোরে, যেন পুষে রাখা রাগ অভিমান যন্ত্রণা ঘৃণা আছড়ে পড়ছে কারুর। ভয় লাগতে লাগলো রূপালির। এই ঝড় বৃষ্টি বাজের মধ্যে এভাবে কে, কেন দরজা ধাক্কাচ্ছে, পলাশও বাড়িতে নেই! 'নাহ্ দরজাটা খুলতেই হবে, পলাশের খোঁজটা করতেই হবে, ভয় পেলে চলবে না।' এবার ভয়কে ছাপিয়ে গেলো উদ্বেগ।
দরজা খুলতেই, সামনে দাঁড়িয়ে আধভেজা পলাশ। পলাশ কিছু বলতে যাওয়ার আগেই গর্জে উঠলো রূপালি, 'এভাবে কেও দরজা ধাক্কায়, একটা কলিং বেল বলেও বস্তু হয়। আর ছিলে কোথায় এতক্ষণ, ফোনও বন্ধ। একটা ফোনও তো করে দিতে পারতে, দেরি হবে যখন।' না এরপর আর পলাশ কিছু বলার সুযোগ পায়নি, কেউ পায়না। দৃষ্টির বাইরে, উলটো দিকটায় কি হচ্ছে কেও জানার চেষ্টা করে না। পলাশ মুখ খুলতে যেতেই নিজের মাথাটা পলাশের বৃষ্টিভেজা বুকে গুঁজে দিয়েছিল রূপালি। তারপর ঠান্ডা ভাত আর প্রায় গলে যাওয়া মাংসের ঝোলের যে স্বাদ সেদিন তারা পেয়েছে, তা বোলে বোঝানোর অপেক্ষা রাখে না।
হাইওয়ের দুর্ঘটনায় পথ অবরোধের জেরে আটকে পড়েছিল পলাশ। তারপর মেঘ বৃষ্টি বাজ শুরু হতেই অবরোধ উঠে যায়। আধভেজা হয়ে বাড়ি ফেরে। কলিং বেল বাজায়, কারেন্ট নেই। ফোন করে, ফোন ডেড। তারপর প্রায় আধা ঘন্টা ধরে দরজা ধাক্কাচ্ছে পলাশ, চিন্তায় ভয়ে হাত পা ঠান্ডা, রগ শক্ত হয়ে এসেছিলো তার। শুধু লোকজন জড়ো করে দরজা ভাঙাটাই বোধ হয় বাকি ছিল।